ঢাকাশনিবার, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, সন্ধ্যা ৬:৪৭

শত্রুর ডেরায় এক বন্ধুর গল্প

ফাইজুল ইসলাম
সেপ্টেম্বর ৯, ২০২২ ৯:২৯ অপরাহ্ণ
পঠিত: 87 বার
Link Copied!

ঐতিহাসিকদের মতে চারজন পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর চোখ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। গ্রীক পুরাণের আফ্রোদিতি, ট্রয় নগরীর রানী হেলেন, রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও ভারতবর্ষের সম্রাট অশোকের পুত্র কুনাল।।

কিন্ত আমার মতে আরো একজন সুন্দর চোখ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার চোখ দিয়ে সমগ্র জীবনে তিনি বাঙালী, বাংলা ও বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তিনি আর কেউ নন, তিনি গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান এ রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী ১৮৯২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে একটি সমভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা কলকাতা হাইকোর্টের খ্যাতনামা বিচারপতি স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দী। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বাবা-মার কনিষ্ঠ সন্তান।

। ১৯১৩ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া সেখানে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯১৮ সালে ‘গ্রেস ইন’ হতে ‘বার এট ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯২১ সালে কলকাতায় ফিরে এসে আইন পেশায় নিয়োজিত হন। ১৯২০ সালে তিনি বেগম নেয়াজ ফাতেমাকে বিয়ে করেন। নেয়াজ ফাতেমা ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আবদুর রহিমের কন্যা।একটি অভিজাত ও ঐতিহ্যমন্ডিত পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি জনসেবামূলক রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাতারে সামিল হন। অল্প সময়ের মধ্যে গণতন্ত্রের মানসপুত্র সোহরাওয়ার্দীর জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নের প্রতীকে পরিণত হন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী। এর আগে ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্ট স্বাক্ষরে তাঁর যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। আর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি মুসলিম লীগ সরকারের দমন-পীড়ন এবং স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার ও প্রতিবাদী।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালির যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, সেটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ফল ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট এবং অবিস্মরণীয় বিজয়। গণতান্ত্রিক রীতি ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তাই সুধী সমাজে তিনি ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ বলে আখ্যায়িত হন।

তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের গণবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তিনি এদেশের জনগণকে সোচ্চার ও সংগঠিত করেছিলেন। তিনি আজীবন দেশবাসীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। এজন্যই দেশবাসী তাঁকে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হিসেবেই জানে।

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তাত্বিক গুরু, রাজনৈতিক গুরু এই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে আমরা শেখ মুজিবের জবানিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের যে অবদান জানতে পারি একজন বাঙালী হিসেবে আজীবন সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।

আপোষহীন এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেন নি। খাজা নাজিমুদ্দিন এর সমর্থন কম থাকা সত্বেও মন্ত্রীত্ব তার কাছে ছেড়ে দেন।।

শেখ মুজিব ও সোহরাওয়ার্দী ফুটন্ত গোলাপ এর দুই রক্তিম পাপড়ি। গুরু শিষ্যের যে অব্যক্ত ভালবাসা তা চিরদিন সকল সংগ্রামে মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।

গুরু যেমন শিষ্যকে ভালবাসতেন, তেমনি শাসনও করতেন একবার মুসলিম লীগের এক সমাবেশে সোহরাওয়ার্দী মুজিবকে বললেন,

“Who are you? You are nobody.”

অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে জাতির পিতা এভাবেই ঘটনাটি উল্লেখ করলেন, তিনি বলেন, “If I am nobody, then why you have invited me? You have no right to insult me. I will prove that I am somebody. Thank you Sir. I will never come to again.”

এ কথা বলে চিৎকার করতে করতে বৈঠক ছেড়ে বের হয়ে এলাম। আমার সাথে সাথে নুরুদ্দিন, একরাম, নূরুল আলমও উঠে দাঁড়াল এবং শহীদ সাহেবের কথার প্রতিবাদ করল। বর্তমান বুলবুল একাডেমির সেক্রেটারি মাহমুদ নূরুল হুদা সাহেব শহীদ সাহেবের খুব ভক্ত ছিলেন। সকল সময় শহীদ সাহেবের কাছে থাকতেন। আমরা তাঁকে ‘হুদা ভাই’ বলে ডাকতাম। হুদা ভাইয়ের ব্যবহার ছিলো চমৎকার। কারও কোনো বিপদ হলে, আর খবর পৌঁছে দিলে যত রাতই হোক না কেন হাজির হতেন। হুদা ভাই ঐ সময় উপস্থিত ছিলেন। আমি যখন বিখ্যাত ৪০ নম্বর থিয়েটার রোড থেকে রাগ হয়ে বেরিয়ে আসছিলাম শহীদ সাহেব হুদা ভাইকে বললেন, “ওকে ধরে আনো।” রাগে আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। হুদা ভাই দৌড়ে এসে আমাকে ধরে ফেললেন। শহীদ সাহেবও দোতলা থেকে আমাকে ডাকছেন ফিরে আসতে। আমাকে হুদা ভাই ধরে আনলেন। বন্ধুবান্ধবরা বলল, “শহীদ সাহেব ডাকছেন, বেয়াদবি কর না, ফিরে এস।” উপরে এলাম। শহীদ সাহেব বললেন, “যাও তোমরা ইলেকশন কর, দেখ নিজেদের মধ্যে গোলমাল কর না।” আমাকে আদর করে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। বললেন, ” তুমি বোকা, আমি তো আর কাউকেই একথা বলি নাই, তোমাকে বেশি আদর ও স্নেহ করি বলে তোমাকেই বলেছি।” আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তিনি যে সত্যিই আমাকে ভালবাসতেন ও স্নেহ করতেন, তার প্রমাণ আমি পেয়েছি তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার দিন পর্যন্ত। যখনই তাঁর কথা এই কারাগারে বসে ভাবি, সেকথা আজও মনে পড়ে। দীর্ঘ বিশ বৎসর পরেও একটুও এদিক অদিক হয় নাই। সেইদিন থেকে আমার জীবনে প্রত্যেকটা দিনই তাঁর স্নেহ পেয়েছি। এই দীর্ঘদিন আমাকে তাঁর কাছ থেকে কেউই ছিনিয়ে নিতে পারে নাই এবং তাঁর স্নেহ থেকে কেউই আমাকে বঞ্চিত করতে পারে নাই। ”

_______________অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পৃষ্ঠা ২৮-২৯

সোহরাওয়ার্দী কেউ নন, তবু তিনি বাঙালীর ভালবাসার এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা।

কেউ কেউ থাকে মানুষের জীবনে নিঃস্বার্থ ভালবেসে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন সেই মহাত্মা যিনি আমাদের নিঃস্বার্থ ভালবেসেছিলেন।

পাকিস্তানি যাযাবরদের সাথে ২৩ বছরের শোষণের সংগ্রামে সোহরাওয়ার্দী আমাদের আস্থার আআশ্রয়স্থল।

উপমহাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সোহরাওয়ার্দী সবসময় ঘৃণা করতেন। জিন্নাহ যেমন মুসলমানদের সহানুভূতি আদায় করতে ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করেছিলেন সোহরাওয়ার্দী সেটি করেন নি।তবু তার জনপিয়তা ছিল পর্বতসম, মানুষ তাকে ভালবাসঅত বাহুডোরে, হৃদয়ে রেখে। আফসোস আজ আমাদের একজন সোহরাওয়ার্দী নেই।

যেই চাটারদল, তেলবাজ জিন্নাহকে কায়েদ এ আজম উপাধি দিয়েছিলেন, এরাই সোহরাওয়ার্দীকে সরিয়ে রাখছিলেন। অথচ সোহরাওয়ার্দীই মুসলিমলীগ, সোহরাওয়ার্দীই অখন্ড পাকিস্তানে হেভিওয়েট রাষ্ট্রনায়ক।

শেখ মুজিবুর রহমান বলেন কাগজে কলমে পাকিস্তানের জাতির জনক জিন্নাহ হলেও মানুষের হৃদয়ে জাতির কান্ডারী ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

সোহরাওয়ার্দীর মত নিঃস্বার্থ মানুষরা যেন দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, এটিই কামনা।

কবি আবুল হাসান বলেছিলেন,

“আমি চলে গেলে থাকব আমি তোমার না থাকা জুড়ে। ”

সোহরাওয়ার্দীও চলে গেছেন, কিন্ত তিনি রয়েছেন বীর বাঙালীর সমস্ত সফলতা, পথচলায়।

বিনম্র শ্রদ্ধা হে বন্ধু, শুভ জন্মদিন

লেখস্বত্বঃ

Faijul Islam Fahim
আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ সম্পাদক,
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।