ঢাকারবিবার, ২৬শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১:৫৯
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিদ্বেষী ইতিহাসবিদদের বিপরীতে অবস্থান নেয়া এক মুঘল সিংহ শাবক

ফাইজুল ইসলাম
জুন ২২, ২০২২ ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ
পঠিত: 45 বার
Link Copied!

হিন্দু পন্ডিতগন সম্রাট আলমগীরকে বিতর্কিত শাসক হিসেবে উপস্থাপন করেন। তবে নিরপেক্ষ ইতিহাসবেত্তারা মনে করেন যে তার হিন্দু মন্দির ধ্বংসের বিষয়টি অতিরঞ্জিত। আমেরিকান ইতিহাসবেত্তা অডিরি টুসকে “Aurangzeb: life and Legacy of India’s most controversial King” লিখেছেন সম্রাট আলমগীরের হিন্দু বিদ্বেষের অভিযোগ শুধু অতিরঞ্জিত তাই নয় তিনি মন্দির নির্মাণে অর্থ অনুদানও করেছিলেন। তার আমলে তার পূর্বসূরীদের তুলনায় প্রশাসনে মুঘল প্রশাসনের সর্বোচ্চ সংখ্যক হিন্দু কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছিল।

পাঞ্জাবের নিকটবর্তী এক গ্রামের ঘটনা উল্লেখ্য। সম্রাট আওরঙ্গজেব প্রেরিত এক মুসলমান সেনাপতি তার বাহীনি নিয়ে পল্লীর ভিতর দিয়ে যাওয়ার কালে এক ব্রাহ্মনের সুন্দরী কন্যা তার নজরে পরে। সেনাপতি ব্রাহ্মনের নিকট সে কন্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং এক মাসের মধ্যে বলে নিশ্চিত জানিয়ে আসেন। ব্রাহ্মন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কতিপয় বুদ্ধিমান লোকের পরামর্শে ব্রাহ্মন সরাসরি সম্রাট আওরঙ্গজেবের শরানাপন্ন হন। সম্রাট আওরঙ্গজেব ধৈর্য করে ব্রাহ্মনের বিপদের কথা শুনলেন। তিনি ব্রাহ্মনকে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন এবং বিয়ের দিন তিনি নিজে বাড়িতে উপস্থিত থাকবেন বলে জানান। কারো নিকট বিষয়টি প্রকাশ না করার জন্য নির্দেশ দিলেন। বিয়ের আগের রাতে সম্রাট সাধারনভাবে গিয়ে ব্রাহ্মনের বাড়িতে উপস্থিত হন। পরদিন যথাসময়ে সেনাপতি বরবেশে ব্রাহ্মনের বাড়িতে এসে হাজির হন। ব্রাহ্মনকে সেনাপতি বললেন যে বিয়ের আগে কন্যা দেখা উত্তম। তখন পূর্ব নির্দেশমত স্থান দেখিয়ে দেওয়া হয় যে কক্ষে সম্রাট রয়েছেন। সেনাপতি সে কক্ষে প্রবেশ করেই নাঙ্গা তলোয়ার হাতে স্বয়ং সম্রাটকে দেখে আতংকে ক্ষমা চাওয়ার আগেই বেহুশ হয়ে মাটিতে পরে যায়। ব্রাহ্মন সম্রাটের ভূমিকা দেখে আপ্লুত হয়ে যায়, সম্রাট তাকে বুকে জরিয়ে ধরে বললেন যে, এটা তারই দায়িত্ব ছিল। দায়িত্বটুকু পালন করতে পেরে তিনি নিজেকে ধন্য মনে করছেন। এই ঘটনার পর ওই গ্রামের সবাই এই ঘটনার স্মরণ রাখতে গ্রামের নাম দেন সম্রাটের নাম অনুসারে “আলমগীর”।

এর পর থেকে বিশেষ করে কেউ আর অন্যথা করার সাহস পায়নি৷ তবে এটা ঠিক তিনি শিয়া মুসলিম এবং হিন্দুদের বেশ কিছু রীতির(সতিদাহ, কৈলাণ্য, তাজিয়া ইত্যাদি) ব্যাপারে কঠোর ছিলেন।

তিনি ছিলেন কুরআনের হাফিজ এবং ব্যক্তিগত জীবনে প্রবাদ তুল্য সাধারণ। কবি যেভাবে বলেছেন,
❝উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষকে আজি দাঁড়ায়ে সগৌরবে
কুর্ণিশ করি বাদশাহে তবে কহেন উচ্চরবে-
আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির,
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।❞

ভারতবর্ষের ষষ্ঠ মোগল সম্রাট। তাঁর পূর্ণ নাম আল-সুলতান আল-আজম ওয়াল খাকান আল-মুকাররম আবুল মুজাফফর মুহি উদ-দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর ।

১৬১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩ নভেম্বর গুজরাটের দাহোদ-এ জন্মগ্রহণ করেন। এর পিতা ছিলেন পঞ্চম মোগল সম্রাট শাহজাহান। মায়ের নাম মুমতাজ মহল। শাহজাহানের চার পুত্রের নাম দারা, সুজা, আওরঙ্গজেব ও মুরাদ।

১৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ মে, এক সামরিক পাগলা হাতি তাঁকে আক্রমণ করে। তিনি সাহসিকতার সাথে দীর্ঘ গদা জাতীয় অস্ত্র দিয়ে হাতির শুঁড়ে আঘাত করে, নিজেকে রক্ষা করেন। এই ঘটনার পর সম্রাট শাহজাহান তাঁকে বাহাদুর খেতাব দেন।

সম্রাট আওরংগজেবের জীবনে উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ও বিদ্রোহগুলো

জাঠ বিদ্রোহ

আগ্রা ও দিল্লী অঞ্চলে বসবাসকারী জাঠ সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ ছিল কৃষিজীবী। এরা ভূমি রাজস্বের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে। সে বিদ্রোহ দমনের পর দ্বিতীয়বার বিদ্রোহ করে সম্রাট শাহজাহানের সময়। এরা তৃতীয়বার বিদ্রোহ করে আওরঙ্গজেবের আমলে। ১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তিলপতি জাঠ জমিদার গোকলার নেতৃত্বে জাঠ কৃষকরা বিদ্রোহ করে। এই সময় আব্দ-উন নবি খান এই অঞ্চলের মোগল প্রশাসক ছিলেন। এরা নবি খানকে হত্যা করে এবং মথুরার আশপাশে লুটতরাজ চালায়। আওরঙ্গজেব এই বিদ্রোহকে কঠোরভাবে দমন করেন। তিনি গোকলোকে হত্যা করেন এবং পরিবারের সদস্যদের জোরপূর্বক মুসলমান বানান। এই বিদ্রোহ দমনের পরও মোগল সৈন্যরা জাঠদের উপর অত্যাচার অব্যাহত রাখে। ফলে ১৬৮৬ খ্রিষ্টাব্দে জাঠরা আবার বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এবারের বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন রাজারাম। এরা আগ্রার নিকটবর্তী সিকন্দ্রায় অবস্থিত আকবরের সমাধি ধ্বংস করে। এরা গেরিলযুদ্ধের মাধ্যমে মোগল সৈন্যদের ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। এই বিদ্রোহ দমনের জন্য আওরঙ্গজেব রাজপুত রাজা বিষণ সিংহকে নিয়োগ করেন। এই সময় আওরঙ্গজেব মধুরা অঞ্চলের জমিদারী প্রদান করেন রাজা বিষণ সিংহকে। ফলে জমিদারী অধিকার নিয়ে জাঠ এবং রাজপুতদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। ১৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে চূড়ামণির নেতৃত্বে জাঠরা ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই যুদ্ধ চূড়ামণি পরাজিত হন এবং তিনি আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু এরপরও জাঠরা চোরাগোপ্তা আক্রমণ অব্যাহত রাখে। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর এরা আগ্রা ও দিল্লী অঞ্চলে ব্যাপক অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল। শেষ পর্যন্ত এরা রাজপুতদের বিতারিত করে স্বাধীন রাজ্য স্থাপনে সক্ষম হয়েছিল।

বুন্দেলা বিদ্রোহ

বুন্দেল খণ্ডে বসবাসরত একদল রাজপুত এই বিদ্রোহ করে। ১৬০২ খ্রিষ্টাব্দে বীরসিংহদেব-এর নেতৃত্বে বুন্দেলরা প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। এরা সে সময়ে বিদ্রোহী যুবরাজ সেলিমের পক্ষে যোগদান করেছিল। সে সময় সম্রাট আকবর বহু চেষ্টা করেও এই বিদ্রোহ দমন করতে পারেন নি। আওরঙ্গজেবের আমলে চম্পত রায়ের নেতৃত্বে রাজপুতরা মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকে। আওরঙ্গজেব এই বিদ্রোহ দমন করেন এবং চম্পত রায় এই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আত্মহত্যা করেন। চম্পতরায়ের পুত্র ছত্রশাল কিছুদিন মোগল রাজকর্মচারী হয়ে দাক্ষিণ্যাত্যে কাটান। পরে শিবাজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৬৭১ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। মোগলদের বিরুদ্ধে তিনি সফলভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এবং ১৭৩১ খ্রিষ্টাব্দে ছত্রশাল যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন বুন্দেল খণ্ড মোগল শাসনের বাইরে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল।

সৎনামী বিদ্রোহ

পাতিয়ালা এবং আলোয়ার অঞ্চলের ‘সৎনামী নামক এক হিন্দু ভক্তসাধক গোষ্ঠীর একজন নিহত হলে, বিদ্রোহী হয়ে উঠে। ১৬৭২ খ্রিষ্টাব্দে আওরঙ্গজেব এই বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করে।

শিখ বিদ্রোহ

সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং সম্রাট শাহজাহন-এর শাসনামলে শিখদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। আওরঙ্গজেবের শাসনামলে তা তীব্র আকার ধারণ করে। ১৬৭৫ খ্রিষ্টাব্দে শিখগুরু তেগবাহাদুরকে বন্দী করে দিল্লীতে আনা হয়। আওরঙ্গজেব তাঁকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার নির্দেশ দিলে তিনি তা অস্বীকার করেন। এই কারণে আওরঙ্গজেবের নির্দেশে তাঁকে হত্যা করা হয়। এরপর তেগবাহাদুরের পুত্র গোবিন্দসিংহ গুরুপদে অধিষ্ঠীত হন। পিতৃহত্যার প্রতিশোধের জন্য গোবিন্দ সিংহ একটি সামরিক বাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি পাঞ্জাবের পর্বতের পাদদেশে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেন। এরপর স্থানীয় হিন্দু রাজাদের মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু হিন্দুরাজাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বে সহায়তা করার জন্য, তাঁরা গোবিন্দ সিংহকে দলে টানার চেষ্টা করেন। গোবিন্দ সিংহ এই আবেদনে সাড়া না দিয়ে হিন্দু জমিদারদের দমন করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ফলে হিন্দু রাজারা আওরঙ্গজেবের সাহায্য প্রার্থনা করেন। এই অবস্থায় মোগলরা আনন্দপুর আক্রমণ করে। প্রথম যুদ্ধে শিখরা মোগলদের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয় বারের আক্রমণে শিখরা পরাজিত হয় এবং গোবিন্দ সিংহ পলায়ন করে। মোগল বাহিনীর হাতে তাঁর দুই পুত্র বন্দী হয়। পরে মোগলরা এঁদের হত্যা করে। পরে আওরঙ্গজেব গোবিন্দ সিংহকে তাঁর দরবারে আমন্ত্রণ জানান। গোবিন্দ সিংহ মোগল দরবারে যাওয়ার পথে একজন আফগান আততায়ীর হাতে নিহত হন।

দাক্ষিণাত্য অভিযান

রাজপুত বিদ্রোহ অনেকাংশে মিটে গেলে আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্য অভিযানে মনোনিবেশ করেন। এই সময় মোগল সাম্রজ্যের প্রতিবেশী রাজ্য বিজাপুর এবং গোলকুণ্ডা শাসক ছিলেন সিয়া মতাবলম্বী দুইজন সুলতান। আওরঙ্গজেব যুবরাজ মুয়াজ্জমকে মারাঠাদের বিরুদ্ধে, অপর যুবরাজ আজমকে পাঠান বিজাপুরে। মুয়াজ্জম কঙ্কন দখল করলেও অচিরেই মারাঠীদের দ্বারা বিতারিত হন। অন্যদিকে আজম সোলাপুর দখল করতে সক্ষম হন। কিন্তু সেখানেও পরে বিজাপুরের বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে বিতারিত হন। ১৬৮৪ খ্রিষ্টাব্দে আওরঙ্গজেব যুবরাজ মুয়াজ্জমকে বিজাপুর আক্রমণের আদেশ দেন। যুবরাজ বিজাপুর আক্রমণের পরিবর্তে একটি বিজাপুরের সুলতানের সাথে সন্ধি করেন। ১৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দে আওরঙ্গজেব বিজাপুরের সুলতানের কাছে, সুলতানের মন্ত্রী সরফরাজ খাঁর পদচ্যুতি দাবী করেন এবং পাঁচ-ছয় হাজার অশ্বারোহী সৈন্য দাবী করেন। সুলতান এই দাবী অগ্রাহ্য করে, বিজাপুরের মোগল অধিকৃত অঞ্চল ফিরে পাওয়ার দাবি করেন। ইতিমধ্যে বিজাপুরের সুলতান গোলকুণ্ডার সুলতানের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে, মারাঠাদের এই যুদ্ধে সামিল হওয়ার প্রস্তাব দেন। আওরঙ্গজেব বিষয়টি বুঝতে পরে, নিজেই বিজাপুর আক্রমণ করেন। ১৬৮৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিজাপুর দখল করেন। বিজাপুরের সুলতান সিকন্দর আদিল শাহকে বন্দী করতে সক্ষম হন। পরে সিকন্দর আদিল শাহকে পাঁচ হাজারি মনসবদার পদ দিয়ে বিজাপুরকে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এরপর তিনি গোলকুণ্ডা অবরোধ করেন। গোলকুণ্ডার সুলতান মোগলদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আওরঙ্গজেব এই যুদ্ধ জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা না দেখে কৌশলের আশ্রয় নেন। আব্দুল্লাহ পানি নামক গোলকুণ্ডার একজন প্রভাবশালী কর্মচারীর বিশ্বাসঘাতকতায় আওরঙ্গজেব আবুল হোসেনকে বন্দী করতে সক্ষম হন। এর ফলে গোলকুণ্ডা আওরঙ্গজেবের অধীকারে আসে।

মারাঠা বিদ্রোহ

বিজাপুর ও গোলকুণ্ডায় জয়লাভের পর মারাঠাদের বিরুদ্ধে আওরঙ্গজেব সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। ইতিমধ্যে শিবাজীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র শম্ভুজী সিংহাসনে বসেন। বাহারানপুর ও আওরঙ্গবাদ আক্রমণের সূত্রে মারাঠারা আওরঙ্গজেবের শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। এছাড়া আওরঙ্গজেবের বিদ্রোহী পুত্র আকবরকে আশ্রয় দেওয়ার জন্যও তিনি মারাঠদের শায়েস্তা করাকে অপরিহার্য মনে করেছিলন। ইতিমধ্যে আকবরকে কেন্দ্র করে মোগল পরিবারের ভিতর অন্তর্দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল। শম্ভুজী আকবরকে যথাযথ সাহায্য না করায় আকবর অসহায় বোধ করেন। এই অবস্থায় ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে মোগলদের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করে পরাজিত হন। শেষপর্যন্ত আকবর ভারতবর্ষ থেকে পালিয়ে পারশ্যে চলে যান। এর ফলে আওরঙ্গজেব এক অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে মুক্তি লাভ করেন।

মারাঠারাজ শম্ভুজী আমোদ-প্রমোদ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে হীনবল হয়ে পড়েছিলেন। এই অবস্থায় আওরঙ্গজেব ১৬৮৯ খ্রিষ্টাব্দে মারাঠদের আক্রমণ করেন। যুদ্ধে শম্ভুজী পরাজিত ও বন্দী হন। পরে আওরঙ্গজেবের আদেশে তাঁর মৃত্যদণ্ড কার্যকর হয়। এই হত্যার মধ্য দিয়ে মারাঠার ঘোরতর মোগলবিরোধী হয়ে পড়ে। এরা মোগল রাজ্যে হানা দিয়ে লুটতরাজ শুরু করে। শম্ভুজীর ছোট ভাই রাজারাম মারাঠা সিংহাসন অধিকার করে, মারাঠা শক্তিকে সংহত করে। আওরঙ্গজেব মারাঠাদের দমনের জন্য অভিযান চালালে রাজারাম জিঞ্জীতে আশ্রয় নেন। এই অবস্থায় আওরঙ্গজেব কর্ণাটক অধিকার করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু রাজারাম ক্রমে শক্তিশালী হয়ে মোগলদের উপর ক্রমাগত আঘাত হানতে থাকে। ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭০৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজারাম যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এই দীর্ঘ যুদ্ধে উভয় শক্তি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সৈন্যক্ষয় আর্থিক ক্ষতির কারণে উভয় পক্ষই অসহনীয় অবস্থার ভিতরে পড়ে। ১৭০৩ খ্রিষ্টাব্দে উভয় পক্ষ শান্তিচুক্তির পথে অগ্রসর হয়। এই সময় আওরঙ্গজেব শম্ভুজীর বন্দী পুত্র শাহু ও তাঁর মাকে মুক্তি দিতে সম্মত হন। একই সাথে তিনি শাহুকে সাত হাজরী মনসবদারী প্রদানে অঙ্গীকার করেন।

শাসনামল জুড়ে আওরঙ্গজেব কিছু নীতি প্রণয়ন করেছিলো যার মূল লক্ষ্য ছিলো, সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং তাদের নেতাদের মঙ্গল নিশ্চিত করা। এছাড়াও, তিনি আদেশ জারি করেছিলেন যা আধিকারিকদের মন্দিরগুলিকে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করা, হিন্দু সম্প্রদায়কে জমি প্রদান এবং হিন্দু আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের উপবৃত্তি প্রদানের নির্দেশ দেয়। দি NCIRT বইটিতে, আওরঙ্গজেব এবং শাহজাহানের মতো মুঘল শাসকদের মহানুভবতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বইটিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আওরঙ্গজেব এবং শাহজাহান মন্দির তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে, শাহজাহান এবং আওরঙ্গজেব এই মন্দিরগুলি মেরামতের জন্যও অনুদান জারি করেছিলেন।

তথাপি, অনেক আধুনিক ভারতীয় আওরঙ্গজেবকে দেখেন হিন্দুদের নিষ্ঠুর নিপীড়ক হিসেবে। তিনি একজন ধার্মিক মুসলিম ছিলেন তাই এটি ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে তিনি তার দীর্ঘ শাসনকাল, প্রায় অর্ধ শতাব্দী, হিন্দু ও হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে তাণ্ডব চালিয়েছেন। এর পিছনে জনপ্রিয় গল্পটি হল এই যে, আওরঙ্গজেব সমস্ত হিন্দুকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করেছিলেন এবং সেই প্রকল্পটি ব্যর্থ হলে তিনি লক্ষ লক্ষ হিন্দুকে হত্যা করেছিলেন। লোকেরা দাবি করে যে আওরঙ্গজেব পরিকল্পিতভাবে হিন্দু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছিলেন, হাজার হাজার হিন্দু মন্দির সমতল করে দিয়েছিলেন।

বর্তমানে, আধুনিক ভারতে, আওরঙ্গজেবের প্রতি ঘৃণা, হিন্দু অধিকারের বাইরেও বিস্তৃত রয়েছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে, এই প্রাক-আধুনিক রাজাকে তুচ্ছ করার জন্য অন্যান্য গোষ্ঠীর নিজস্ব রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। আরও ব্যাপকভাবে, স্কুলের পাঠ্যপুস্তক এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে, ধর্মান্ধ আওরঙ্গজেবের ঔপনিবেশিক যুগের চিত্র ভারতীয় সমাজের গভীরে প্রবেশ করেছে। অনেক ভারতীয় এই ধরনের মতামতের পিছনে ঝামেলাপূর্ণ রাজনীতি বুঝতে না পেরে আওরঙ্গজেব সম্পর্কে ভুল তথ্যযুক্ত ধারণাগুলি গ্রহণ করে এবং পুনরাবৃত্তি করে।

আওরঙ্গজেব একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের শীর্ষে আরোহণ করেছিলেন যার নেতৃত্ব, প্রশাসনিক এবং যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা একজন কার্যকর রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিতর্কিত ইন্দোলজিস্ট অড্রে ট্রসের মতে ইতিহাসে বর্ণিত আওরঙ্গজেবের অস্তিত্বের দ্বারা অনেক হিন্দুত্ববাদী আজ সত্যিকারের আহত বোধ করছেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন যে, আওরঙ্গজেব যতটা হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন তার চেয়ে বেশি রক্ষা করেছিলেন।

এই অবস্থায় ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মার্চ আহমেদ নগরে আওরঙ্গজেব মৃত্যবরণ করেন। প্রথম বাহাদুর শাহ দিল্লির সিংহাসনে বসেন।

লেখক: ফাইজুল ইসলাম
আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

তথ্যসূত্র: ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস- মধ্যযুগ: মোগল পর্ব- এ কে এম শাহনেওয়াজ (pub-2015, p 149-155)

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।