ঢাকারবিবার, ১৪ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, সন্ধ্যা ৬:১৭

মাইকেল মধুসূদন দত্ত : উত্তরাধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ

দৈনিক সৈকত সংবাদ
জানুয়ারি ২৫, ২০২২ ২:৫৯ অপরাহ্ণ
পঠিত: 108 বার
Link Copied!

“আমি এক সকালে উঠে নিজেকে সফল হিসেবে পাইনি, এই কাব্যের সফলতা বহু বছরের কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।” শ্রীযুক্ত মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের সেই প্রবাদপ্রতিম মহাপুরুষ যার ক্ষণজন্মা জন্ম বাংলা সাহিত্যকে শুধু দিয়েই গেছেন। বাংলা আধুনিক কবিতার জনক, বাংলা মহাকাব্যের জনক, বাংলা চতুর্দশপদী কবিতার জনক, অমৃত্রাক্ষর ছন্দের জনক এই জাদুকর। প্রতিভাকে যদি বাংলা সাহিত্যের বিচারে মানদণ্ড করা হয় তবে শ্রী মধুসূদন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বেশি প্রতিভাবান। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের শিকল ভেঙে মাইকেল যে ভাবধারার সৃষ্টি করেছেন তাতেই তিনি সর্বকালের সেরাদের কাতারে পৌছে গেছেন।

তার প্রহসন, নাটক বাংলা সাহিত্যে নতুন রস তৈরি করেছে। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও এই মহাত্মার শেষ জীবন সুখকর ছিল না। তার সমাধির উপর লেখা আছে, ” দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণাকাল! এ সমাধিস্থলে (জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি বিরাম) মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন! যশোরে সাগর দাড়ী কবতক্ষ-তীরে জন্মভূমি, জন্মদাতা দত্ত মহামতি রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী!”

মধুসূদন আমাদের বাংলাদেশের যশোর জেলার অন্তর্গত কেশবপুর থানার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মেছিলেন ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি। তাঁর বাবা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন এলাকার বড় জমিদার। মায়ের নাম জাহ্নবী দেবী। ছাত্রজীবনে মধুসূদন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। স্কুলের পাট চুকিয়ে কলকাতার হিন্দু কলেজে অধ্যয়নের সময় দুজন ইংরেজ শিক্ষকের বেশ প্রভাব ছিল মধুসূদনের ওপর। তাঁরা হলেন ডিরোজিও (ডি রোজারিও) ও রিচার্ডসন।

ডিরোজিও তাঁর ছাত্রদের ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতি-এসব বিষয়েরই দোষগুণ আলোচনা করে নিজেদের কর্তব্যপথ নির্ণয় করতে শিক্ষা দিতেন। রিচার্ডসনও কবির একজন আদর্শ পুরুষ ছিলেন। তাঁর অনুপ্রেরণায়ই কবি কলেজজীবনে শুধু ইংরেজিতেই কাব্যচর্চায় আকৃষ্ট হন। ১৮৪৩ সালে তিনি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন এবং মূল নামের আগে যুক্ত করেন ‘মাইকেল’ নামটি। ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে তার বাবা তাকে ত্যাজ্য করেছিলেন। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার পর মধুসূদন পড়াশোনা করেছিলেন শিবপুরের বিশপস কলেজে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত নানা কারণে পড়াশোনা শেষে মাদ্রাজে চলে যান। সেখানে একটি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও ইংরেজিতে সাহিত্য চর্চা চালিয়ে যান তিনি। ছদ্মনামে লিখেছেন পত্রিকায়ও। ‘হিন্দু ক্রনিকল’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করলেও অর্থাভাবে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। মাদ্রাজে থাকাকালীন সাহিত্যিক হিসেবে মধুসূদনের নাম ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৪৯ সালেই তিনি ‘Captive Lady’ কাব্য রচনা করেন। কিন্তু কবির এই অনন্য প্রতিভার কথা তৎকালীন কলকাতার সংবাদপত্রসমূহ তেমনভাবে প্রচারে আগ্রহী হতো না। এমনকি বাঙালি পাঠকরাও কবির এই কাব্যকর্মকে প্রসন্নচিত্তে গ্রহণ করেননি।

ফ্রান্সের ভার্সাই নগরে থাকার সময় কবি লেখেন তার কালজয়ী “কপোতাক্ষ “কবিতা, “সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে; সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে শোনে মায়া- মন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে। বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ-দলে, কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে? দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্মভূমি-স্তনে।” এরই একপর্যায়ে ১৮৫৬ সালে কবি মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন এবং নিজ ভাষায় সাহিত্যকর্ম রচনায় নিবিষ্ট হন।

এখানে উল্লেখ্য, ১৮৪৮ সালে মাদ্রাজে অবস্থানকালে রেবেকা নাম্নী এক স্কটিশ মেয়েকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিয়ের সাত বছর পর তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ১৮৫৬ সালে কবি মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজের এক অধ্যাপকের মেয়ে কুমারী হেনরিয়েটাকে বিয়ে করেন। তিনিই মাইকেল মধুসূদনপত্নী হিসেবে সমধিক পরিচিত। ইংরেজি সাহিত্য থেকে ছিটকে পড়ে বন্ধু মহলের পরামর্শে মধুসূদন বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে উপহার দেন শর্মিষ্ঠা, পদ্মাবতী, তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য, কৃষ্ণকুমারী, মেঘনাদবদ কাব্য, ব্রজাঙ্গনা কাব্য, বীরাঙ্গনা কাব্য, চতুর্দশপদী কবিতাবলি, হেক্টরবধ এর মতো বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম।

১৮৬১ সালে কবি মধুসূদন এর মেঘনাদবধ কাব্য বাংলা সাহিত্যের প্রথম এবং এক অর্থে একমাত্র মহাকাব্যের মর্যাদায় আসীন; বাংলা ভাষায় সনেট সৃষ্টি ও পরিচর্যায় এখনও পর্যন্ত মধুসূদন অবিকল্প ব্যক্তিত্ব! পত্রকাব্য রচনায়ও তিনি দেখিয়েছেন পথপ্রদর্শকের প্রণোদনা। মধুসূদনের জন্ম বাংলার ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণে। উনিশ শতকের শুরুতে এ ভূখণ্ডে ঘটে নানান পরিবর্তন; বাংলার নবজাগরণের সে এক বিরাট শুভসময়! ইউরোপ-আমেরিকার শিক্ষা-সভ্যতা-সংস্কৃতি-ধর্ম-দর্শন-মানবতা-ইতিহাস প্রভৃতির প্রভাব ভারতবাসীর জীবনে সামগ্রিকভাবে আমূল পরিবর্তনের আবহাওয়া প্রবাহিত করল। আত্মমুক্তির আবাহন আর সংস্কারমুক্তির চিন্তা তখন ভারতকে আন্দোলিত করেছিল। মধুসূদন বাংলায় সনেট লেখার আগে ইংরেজিতে আঠারোটি সনেট রচনা করেছেন। তিনি অবশ্য ভার্সাই থেকে গৌরদাসকে লেখা এক চিঠিতে সনেট রচনায় পেত্রার্ককে অনুসরণ করবেন বলে জানিয়েছিলেন।

১৮৬৫ সালে লেখা একটি চিঠির কিছু অংশ তুলে ধরছি : ‌‌‌‌I have been lately reading petrarca- the Italian poet, and scribbling some sennets after his manner. There is one addressed to this very river [কপোতাক্ষ নদ]… I hope to come out what you all think of this new style of poetry. ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে কবি মধুসূদন বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে একটি চিঠিতে জানিয়েছিলেন যে, তিনি বাংলা ভাষায় সনেট রচনা আরম্ভ করেছেন এবং কবি-মাতৃভাষা নামে একটি সনেট লেখার কাজ সমাপ্ত করেছেন। পরবর্তীকালে ওই সনেটটি বঙ্গভাষা নামে তাঁর “চতুর্দশপদী কবিতাবলী” গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। বঙ্গভাষা বাংলা সাহিত্যের প্রথম সনেট। কবিতাটির বিষয়ভাবনা এবং পরিবেশনশৈলী মার্জিত-পরিশীলিত ও সংহত। ভুলের জন্য মনোবেদনা এবং ধারাপরিবর্তন করে সিদ্ধি অর্জনের পরিতৃপ্তি কবিতাটির মূল কথা! চতুর্দশপদী কবিতা লিখতে গিয়ে মধুসূদন ইতালির কবি জগৎখ্যাত সনেট-রচয়িতা পেত্রার্ক এবং ইংরেজ কবি মিল্টনের কলাকৃতি বিশেষভাবে অনুসরণ করেছেন।

বঙ্গভাষা কবিতার শুরুতে লেখকের মানসিক বেদনাবোধ আর আত্ম-উপলব্ধির বিবরণ সাজানো হয়েছে এভাবে : হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;- তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি, পর-ধন-লোভে মত্ত, করিণু ভ্রমণ পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি। কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি! অনিদ্রায়, অনাহারে সঁপি কায়, মনঃ, মজিনু বিফল তপে অবরণ্যে বরি;- কেলিনু শৈবালে, ভুলি কমল-কানন! [বঙ্গভাষা] ভাষার প্রতি মধুসূদনের মমত্ববোধের আরেকটি নিদর্শন তাঁর “ভাষা” শীর্ষক কবিতা। ভাষাকে রূপময় মায়ের অধিক রূপবতী কন্যা হিসেবে বিবেচনা করে তিনি যে অভিনব চিন্তার প্রকাশ ঘটালেন, তা নিশ্চয়ই বাংলা কাব্যপরিসরে নতুনতর সংযোজন। বাঁশির সুরের মোহময়তা বা সময়ের সৌন্দর্যের লাভ-ক্ষতির বিবেচনার বাইরে ভাষার অপরূপতা কবিকে মুগ্ধ করেছিল, তা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না; ভাষার আলোক যেন তাঁর চোখে দেশমাতার আকাশে শোভমান চাঁদের লাবণ্য! তাঁর অভিমত- মূঢ় “সে, পণ্ডিতগণে তাহে নাহি গণি, কহে যে, রূপসী তুমি নহ, লো সুন্দরি ভাষা!- শত ধিক্ তারে!” [ভাষা] দেশমাতা আর নিজভাষার প্রতি মাইকেলের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যাবে তার বিভিন্ন কবিতায়।

তাঁর স্বাজাত্যবোধক অনুভূতি ইতালীয় কবি ফিলিকেইয়ার কণ্ঠের সাথে মিলিয়ে দেখলে এমনটা দাঁড়ায় : “কুক্ষণে তোরে লো, হায়, ইতালি! ইতালি!/এ দুঃখ-জনক রূপ দিয়াছেন বিধি। ” “ভারত-ভূমি” কবিতাটির শেষ দুটি পঙক্তি উদ্ধৃত হলো : “কার শাপে তোর তরে, ওলো অভাগিনি, চন্দন হইল বিষ; সুধা তিত অতি?” প্রবাস-অসুবিধা থেকে মুক্তির জন্য মাইকেলের যে কান্না, তা বোধকরি আজও শেষ হয়নি; বাংলাদেশের বাইরে যেসব বাঙালি জীবিকার জন্য, জাগতিক সাফল্য অর্জনের জন্য অবস্থান করছেন, [কিংবা কে জানে হয়তো অন্য কোনো মোহে আটকে আছেন প্রবাসের আঠালো জড়তায়!] তারাও আজ ভেতরে ভেতরে কাঁদছেন কবির মধুসূদনের মতো! কতক খবর আমরা কাগজের পাতায় পাই আর অনেকটাই থাকে অপ্রকাশ! এমনকি পৃথিবীর যে কোনো দেশের যে কোনো প্রবাসীর জন্যও হয়তো এসব কান্নার আওয়াজ সত্য, তাও হয়তো অনুভব করা যায়! কবিতা, নাটক, মহাকাব্য এই তিনটি ক্ষেত্রেই মানুষকে অসম্ভব গ্রাহ্য করে একটি সত্যিকার মূল্যবোধ ও বাস্তবতা প্রতিষ্ঠা করেন। যেমন ‘কৃষ্ণ কুমারী’ নাটকে জীবনের নিগূঢ় চিত্র ফুটে উঠেছে। বিসংবাদ ও সঙ্ঘাতের মধ্য দিয়ে নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের বিপন্ন জীবনের ছবি দেখা যায়। এক অনিবার্য অসহায়তা মানুষকে করেছে বিহ্বল, করুণ পরিণতির মুখোমুখি। এ ঘটনা সর্বকালের মানুষের জন্য একটি অনিবার্য সত্য বহন করে। মধুসূদনের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কর্ম “মেঘনাদ বধ” মহাকাব্য পরিশেষে কবি মধুসূদন এর ভাষায় বলতে হয়, শৈশবে, অবোধ আমি! ডাকিলা যৌবনে; (যদিও অধম পুত্র, মা কি ভুলে তারে?) এবে- ইন্দ্রপ্রস্থ ছাড়ি যাই দূর বনে! এই বর, হে বরদে, মাগি শেষ বারে,- জ্যোতির্ম্ময় কর বঙ্গ- ভারত-রতনে!” [সমাপ্তে] প্রতিভা আর কর্মপ্রেরণার সাথে মাইকেলের উচ্চাভিলাষী চিন্তাধারা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য এক বড়ো পাওয়া।

আজ কবির ১৯৮ তম জন্মবার্ষিকী। মাইকেল মধুসূদন শুধু বাংলা ভাষার কবি নন, তিনি সারা পৃথিবীর কবি যিনি মা,ভাষা ও মাতৃভাষাকে ভালোবাসার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

লেখস্বত্ব : ফাইজুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।